তিস্তা চুক্তি হলে বাংলাদেশ পানি পেত : মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

মোহাম্মদ ইউনুস আলী

 

‘বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, তিস্তা চুক্তি হলে বাংলাদেশ পানি পেত। বহুদিন আগে থেকে শুনে আসছি তারা তিস্তা চুক্তি করবে। কিন্ত এখনো তা করেনি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী তিস্তা চুক্তি নিয়ে যা বলেছেন, তা সঠিক নয়। ১০ বছর আগে যদি তিস্তা চুক্তি হতো, তাহলে আমরা পানি পেতাম। মূলত ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে সম্পর্ক রয়েছে, সেই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারতকে দিয়েই যাচ্ছে, বিনিময়ে কিছুই পাচ্ছে না।’

 

মঙ্গলবার (১৬ মার্চ) বেলা সাড়ে ১১টায় মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার পাচুরিয়ার নিজ গ্রামে প্রয়াত মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের ১০ম মৃত্যু বার্ষিকীতে কবরে জিয়ারত শেষে সাংবাদিকদের এ সব কথা বলেন তিনি।

 

বিএনপির মহাসচিব বলেন, এখনো সীমান্তে আমাদের নাগরিক হত্যা বন্ধ করতে পারিনি। তিস্তাসহ ভারত থেকে যে নদীগুলো আমাদের দেশে প্রবাহিত হচ্ছে, সে নদীগুলোর কোনো হিস্যা আমরা এখনো পাইনি। বর্তমান সরকার ভারতকে শুধু দিয়েই যাচ্ছে, কিন্ত ভারত থেকে কিছুই আনতে পারছে না। এ জিনিসগুলো এ দেশের মানুষ কখনোই মেনে নেবে না।

 

মহাসচিব বলেন, বাংলাদেশে কোনো গণতন্ত্র নেই। যারা ক্ষমতায় বসে আছে, তারা বেআইনিভাবে বসে আছে। অনির্বাচিত সরকার বেআইনিভাবে দেশে একনায়কতন্ত্র কায়েম করেছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করে দেশের গণমাধ্যমের কণ্ঠকে রোধ করা হয়েছে। দেশে জনগণের ভোটের অধিকার নেই। সাধারণ মানুষের অধিকারকে ফিরিয়ে আনতে গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে আরও জোরদার করতে হবে।

 

মির্জা ফখরুল বলেন, জিয়াউর রহমানের খেতাব বাতিলের ক্ষমতা জামুকা ও সরকারের নেই। তার খেতাব বাতিল করা হলে স্বাধীনতার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে এবং মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করা হবে।

 

এ সময় চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুস সালাম, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হাবিবুর রহমান হাবিব, মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপির নবনির্বাচিত সভাপতি আফরোজা খান রিতা, বিএনপির প্রয়াত মহাসচিবের বড় ছেলে ড. খন্দাকার আকবর হোসেন বাবলু এবং মেঝ ছেলে খন্দকার আবদুল হামিদ ডাবলুসহ বিএনপির নেতা-কর্মী ও স্থানীয় গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

 

ড. খন্দাকার আকবর হোসেন বাবলু বলেন, ২০১১ সালের এই দিনে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় খন্দকার দেলোয়ার হোসেনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন মানিকগঞ্জ জেলার পাঁচুরিয়ায় ১৯৩৩ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫২ সালে অনার্স ও ১৯৫৩ সালে মাস্টার্স পাস করেন। ১৯৫৫ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি চার ছেলে ও দুই মেয়ের জনক। ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে দেলোয়ার সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

 

ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালনের জন্য একুশে পদকে ভূষিত হন। তিনি ঘিওর-দৌলতপুর নির্বাচনী এলাকা থেকে ২য়, ৫ম, ৬ষ্ঠ, ৭ম, ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। একাধিকবার চিফ হুইপ ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৭ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর খোন্দকার দেলোয়ার বিএনপির মহাসচিব নিযুক্ত হন। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পুরো সময় বিএনপির নানা সংকটে খালেদা জিয়ার পক্ষে তিনি জোরালো ভূমিকা পালন করেন। তৎকালীন সরকার জোর করে বিএনপির নেতৃত্ব বদল করতে চাইলেও খোন্দকার দেলোয়ারের জোরালো ভূমিকায় সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। তিনিই সেই যাত্রায় বিএনপিকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করেন।

 

বিএনপির পঞ্চম কাউন্সিলের পর মহাসচিব পদ নিয়ে নানা গুঞ্জন শোনা গেলেও দেলোয়ারকেই ফের মহাসচিব করা হয়। এর কিছুদিন পর থেকেই তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রায়ই তাকে হাসপাতালে যেতে হতো। সেখান থেকেও তিনি দলকে নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন। দেশের ইতিহাসে খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন শুধু একজন রাজনীতিবিদই নন, তিনি ছিলেন আপসহীন। ওয়ান ইলেভেনের জরুরি সরকারের সময় বিএনপির সিনিয়র অনেক নেতাই যখন খালেদা জিয়াকে মাইনাস করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তখন রক্ত চক্ষুকে উপেক্ষা করে তিনি বিএনপির ঝা-াকে একাই তুলে ধরেছেন।

 

এই নিভৃতচারী জননেতা যে এলাকাবাসীর কতটা আপনজন ছিলেন তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল আরমানীটোলা থেকে মানিকগঞ্জের পাঁচুরিয়া পর্যন্ত শোকার্ত মানুষের বিশাল সমাবেশ। সেখানে দেখা গেছে অশ্রুসিক্ত নয়নে জনতার নীরব মিছিল। তার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি ও অঙ্গ দলগুলো নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।

 

এ ছাড়া বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দিবসটি উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন। বাণীতে তিনি বলেন, বিএনপির সাবেক মহাসচিব, বরেণ্য রাজনীতিবিদ অ্যাডভোকেট খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুবার্ষিকীর এই দিনে আমি তার বিদেহী আত্মার প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। বাংলাদেশে মরহুম খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন একজন দৃঢ়চেতা, আদর্শনিষ্ঠ রাজনীতিবিদ হিসেবে দেশের মানুষের মনে শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত থাকবেন। দৃঢ়তা, অটুট মনোবল এবং ব্যক্তিত্বে তিনি ছিলেন অনন্য উচ্চতায় একজন ব্যতিক্রমী রাজনীতিবিদ। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধিকার, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও জনগণের মুক্তির সব সংগ্রামে তিনি রেখেছেন অসামান্য অবদান। ১/১১-এ দেশের এক চরম রাজনৈতিক ক্রান্তিকালে বিএনপি মহাসচিবের দায়িত্ব্ব কাঁধে নিয়ে খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন দলের বিরুদ্ধে চক্রান্ত রুখে দিতে যোগ্য নেতৃত্বের স্বাক্ষর রেখেছিলেন।

 

স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী দর্শনকে বুকে ধারণ করে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে স্বৈরাচারের কবল থেকে গণতন্ত্র উত্তরণের প্রত্যেকটি আন্দোলন সংগ্রামে খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের অবদান দল ও দেশবাসী চিরদিন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।

 

দিবসটি উপলক্ষে আজ বেলা ১১টায় বিএনপির উদ্যোগে নয়াপল্টন দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নিচতলায় মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছে। এছাড়া বাদ জোহর খোন্দকার দেলোয়ারে গ্রামের বাড়ী মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার পাঁচুরিয়ায় মাজার জিয়ারত ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।