মানিকগঞ্জের পদ্মা-যমুনার পাড় ভাঙ্গন শুরু    আতঙ্কে নদী তীরবর্তী গ্রামবাসী

মানিকগঞ্জ টাইমস রিপোর্ট ॥

এ বছর বর্ষা মওসুম শুরু হতে না হতেই মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয়ের পদ্মা-যমুনা নদীর পাড়ে ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। এতে আতঙ্কে রয়েছে রয়েছে নদী
তীরবর্তী বিভিন্ন গ্রামবাসী। ভাঙ্গন কবলিত গ্রামগুলোর মধ্যে আরিচা ঘাট সংলগ্ন দক্ষিণ শিবালয়, ছোট আনুলিয়া ও অন্বয়পুর গ্রাম।

ঘুর্ণিঝড় ইয়াস ও কয়েক দিনের বৃষ্টির প্রভাবে বিগত কয়েক দিনে এ তিনটি গ্রামের নদী পাড় এলাকার বেশ কিছু অংশ নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এবছর ভাঙ্গনের যে ভয়াবহতা দেখা যাচ্ছে আগে থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এ তিনটি গ্রাম নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশংকা করছেন স্থানীয়রা। ইতিমধ্যে নদী ভাঙ্গন রোধে ভুক্তভোগী এলাকাবাসী শিবালয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবরে লিখিত আবেদন করেছেন।

ভাঙ্গন কবলিত এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয় উপজেলার দক্ষিণ শিবালয়, ছোট আনুলিয়া ও অন্বয়পুর গ্রামের নদী পারের প্রায় ৬শ’ থেকে ৭শ’ ফুট এলাকার বাড়ি-ঘর এবং ফসলি জমি এমনিতেই বিগত বর্ষা থেকেই তীব্র নদী ভাঙ্গনে হুমকির মুখে রয়েছে। গ্রামবাসীরা অনেকই আতংকের মধ্যে রয়েছেন। এবার বর্ষা শুরু হবার আগেই ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে । নদীর পানি বাড়ার সাথে সাথে ব্যাপক আকারে নদী ভাঙ্গনের সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া, আরিচা কাশাদহ সেচ প্রকল্পের পানির পাম্প হাউজটি হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। ভাঙ্গন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।

ভূক্তভোগীদের কয়েকজন বলেন, গত বছর থেকে এ তিনটি গ্রামের নদী ভাঙ্গন সর্বকালের ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। নদী ভাঙ্গনের কারণে এ এলাকার লোকজন এখন আতংকের মধ্যে বসবাস করছেন। নদীর পাড় এলাকা দিয়ে বেড়ীবাঁধ নির্মাণ এবং নদী শাসন করলে হয়তো নদী ভাঙ্গন রোধ করা সম্ভব হবে। তা না হলে পূর্ব পুরুষের ভিটাবাড়ি, জায়গা জমি সব নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। নদী ভাঙ্গন রোধে জরুরী ভিত্তিতে আরিচা ঘাট সংলগ্ন নিহালপুর এলাকা হতে পাটুরিয়া ঘাট পর্যন্ত বেড়ীবাঁধ নির্মান ও নদী শাসনের দাবী জানিয়েছেন তারা।

 

নদী ভাঙ্গন রোধে ভাঙ্গন কবলিত এলাকাবাসী এবং শিবালয় বন্দর ব্যবসায়ী সমাজ কল্যাণ সমিতি’র পক্ষ থেকে মাননীয় মন্ত্রী পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়,
মাননীয় সংসদ সদস্য মানিকগঞ্জ-১, জেলা প্রশাসক মানিকগঞ্জ, উপজেলা নির্বাহী অফিসার শিবালয়, নির্বাহী প্রকৌশলী বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং নির্বাহী প্রকৌশলী বিআইডব্লিউটিএ বরাবর একাধিকবার আবেদন করা হয়েছে।

অন্বয়পুর গ্রামের মো. আকতার হোসেন বলেন, নদীর মাঝে চর পড়ার কারণে পানির পাড় এলাকা দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যে কারণে এবার বর্ষা
আসার আগেই আমাদের গ্রামটিতে নদী ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। এখন থেকেই ভাঙ্গন রোধে যদি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয় তাহলে অচিরেই গ্রাম তিনটি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। মানিকগঞ্জ-১ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য এ এম নাঈমুর রহমান দূর্জয় ভাইয়ের কাছে আমাদের আকুল আবেদন অতি দ্রুত এই ভাঙ্গন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

স্থানীয় সুনিল হলদার বলেন, আমার মোটামোটি ৭৫ বছর বয়স। এ বয়সে ছোট আকারে অনেক ভাঙ্গন দেখেছি। কিন্তুু এবার যে ভাঙ্গনে ধরেছে ভয়ংকর
ভাঙ্গন এখন আমরা হতাশায় পড়ে গেছি। আবাদি জমি ও গাছ পালা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বিগত ৫০বছরেও এরকম নদী ভাঙ্গন আমরা দেখিনি। মো. সমসের মোল্লা জানান, এই নদীটা ছিল অনেক দুরে। আস্তে আস্তে ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে এ পর্যন্ত এসেছে। এবছর অতিরিক্ত ভাঙ্গছে। এ ভাঙ্গন রোধে কেউ কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না।

ঠান্ডু পরধান বলেন, কয়েক বছর ধরে কিছু কিছু করে নদী ভাঙ্গে। এবছর অনেক ভাঙ্গছে। এভাবে নদী ভাঙ্গতে থাকলে আমাদের থাকাতো অনেক অসুবিধা হয়ে পড়বে।
সন্ধ্যা রানী হালদার বলেন, আমরা হলদার মানুষ নদী ভাঙ্গনের কারণে আমরা বাড়িতে থাকতে পারিনা, ঘুমাতে পারিনা,খাইতে পারিনা। আমরা এক ভাঙ্গা
দিয়ে জাফরগঞ্জ থেকে এখানে এসেছি। এখানে এসেও সেই নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়েছি। হলদার মানুষ স্বামী কামাই করতে পারেনা। ছেলেদের লেখা পড়া করাইতে পারি নাই। খুব কষ্টে দিন কাটছে কেউ কোন খোঁজ-খবরও নেয় না।

এদিকে, শিবালয়ের পদ্মা নদী তীরবর্তী আরুয়া ইউনিয়নের অন্তর্গত নয়াকান্দী, মান্দ্রাখোলা এলাকাতেও ভাঙ্গন বিগত বছরের ন্যায় বর্তমানেও নদী
ভাঙ্গন সম্ভবনা দেখা দেয়ায় পূর্ব প্রস্তুতী হিসেবে এ বছর বর্ষা মওসুমের আগেই স্থানীয় নয়াকান্দী গ্রামের মৃত রফিজ উদ্দিন প্রামানিকের পুত্র আমেরিকা প্রবাসী মো: আব্দুল মালেক এর আর্থিক সহায়তায় জিও ব্যাগ ক্রয় করা হলে স্থানীয় নয়াকান্দী গ্রামবাসীর সেচ্ছাশ্রমে চার হাজার বালু ভর্তি জিও ব্যাগ নদীর তীরে ফেলা হচ্ছে। জিও ব্যাগ ফেলার সার্বিক তত্বাবধানে রয়েছেন আসলাম হোসেন, কহিনূর ইসলাম, প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলাম রনি, সাংবাদিক সুমন হোসেন, রউফ মুন্সীসহ শতাধিক গ্রামবাসী।

নয়াকান্দী গ্রামের বাসিন্দারা দাবী করেন, তাদের নিজেদের উদ্যোগের এ কাজের পাশাপাশি সরকারি সহয়তা প্রয়োজন। তাহলে হয়তবা এবাবের বর্ষায়
নদী ভাঙ্গন রোধ করা সম্ভব হবে। তবে, তারা নদী ভাঙ্গন রোধে স্থায়ী বেঁড়িবাঁধের দাবী জানান।

এ ব্যাপারে মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাঈন উদ্দিন জানান, শিবালয়ের নদী ভাঙ্গন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্থানীয় এমপি মহোদয় আমাকে তাগিদ দিয়েছেন। আমরা আমাদের উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি অনুমতি পেলেই কাজ শুরু করবো।

হারিরামপুরে ভাঙ্গন

মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর উপজেলার কাঞ্চনপুর ইউনিয়ন এর তিনটি গ্রামের প্রায় অর্ধেকের বেশি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। নদী ভাঙ্গন মানিকগঞ্জ জেলায় প্রায় প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে হয়ে থাকে, কিন্তু এবার আগাম নদী ভাঙ্গনের কারণে সর্বশেষ ১০ দিনে প্রায় ২০টি বসতবাড়ি এবং ৫০ হেক্টর ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হযে গেছে।

ঘরবাড়ি জায়গা-জমি হারিয়ে দিশেহারা গ্রামবাসী, আতঙ্কে দিন কাটছে প্রতিটি সময। তিনটি গ্রামের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে কুশিয়ার চোর এরপর মালুচী ও কোডকান্দি যথেষ্ট পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।

গত কয়েক দিনের নদী ভাঙ্গনের কারণে পরিবার পরিজন নিয়ে রাস্তায় দিন কাটাতে হচ্ছে অনেক পরিবারকেই।

গ্রামবাসী জানান, ভাঙ্গন রোধে সরকার যদি স্থায়ীভাবে বেরিবাদের ব্যবস্থা করে তাহলে পদ্মার হাত থেকে বাঁচবে গ্রামবাসী ।