সাভারে সিসিডিবির’র ‘বায়োচার ও বায়োচার ইনরিচ অর্গানিক ফার্টিলাইজার বানিজ্যিকীকরণ সক্ষমতা বৃদ্ধি কর্মশালা শুরু

সাভারে সিসিডিবির’র ‘বায়োচার ও বায়োচার ইনরিচ অর্গানিক ফার্টিলাইজার বানিজ্যিকীকরণ সক্ষমতা বৃদ্ধি কর্মশালা শুরু

মোহাম্মদ ইউনুস আলী

সিসিডিবি বায়োচার প্রজেক্টের উদ্যোগে সভাপর হোপ সেন্টার প্রশিক্ষণ কক্ষে কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘বায়োচার ও বায়োচার ইনরিচ অর্গানিক ফার্টিলাইজারের প্রচার-প্রসার এবং বানিজ্যিকীকরণ সক্ষমতা বৃদ্ধি’ বিষয়ক তিনদিনব্যাপী কর্মশালা ১৬ আগস্ট শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ICCO ও Kerk in actie এর আর্থিক সহায়তায় বায়োচার প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।

সিসিডিবি বায়োচার প্রকল্পের সমন্বয়কারী মিঃ সমীরন বিশ্বাসে সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উক্ত প্রশিক্ষণে উপস্থিত ছিলেন বায়োচার প্রজেক্টের কেন্দ্রীয় অফিসের টেকনিক্যাল অফিসার মিঃ কৃষ্ণ কুমার সিংহ, মনিটরিং অফিসার এ্যাডলিনা রিচেল বৈদ্য, শিবালয় কর্ম এলাকার মার্কেটিং অফিসার মোঃ আবু সুফিয়ান, মার্কেটিং অ্যাসিসট্যান্ট মোঃ রাকিব হোসেন ও কিচেন ফ্যাসিলিটেটর মিসেস দিপালী সরকার এবং মান্দা কর্ম এলাকার মার্কেটিং অফিসার মিঃ নির্মল টুডু, মার্কেটিং অ্যাসিসট্যান্ট মিঃ ইষ্টিফেন হেমরম ও কিচেন ফ্যাসিলিটেটর কৃষ্ণা রানী।

প্রথম দিনে প্রধান অতিথি হিসেবে প্রশিক্ষনের শুভ উদ্ধোধন করেন হোপ ফাউন্ডেশন ট্রাস্টি বোর্ড ভাইস চেয়ারম্যান ড. কাজী তৌউফিকুল ইসলাম। এ সময় হোপ ফাউন্ডেশন ট্রাষ্টি বোর্ড ট্রেজারার মিঃ জেমস শুকলাল হালদার, হোপ ফাউন্ডেশন ম্যানেজার মিঃ কালিপদ সরকার, অ্যাডমিন এন্ড ফাইন্যান্স অফিসার মিঃ রবার্ট বিশ্বাস উপস্থিত ছিলেন।
বক্তারা বলেন-বায়োচার প্রকল্প সিসিডিবির একটি সময় উপযোগী পদক্ষেপ। জলবায়ূ পরিবর্তন মোকাবেলায় বিশ্বব্যাপি যে সকল উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তার মধ্যে এটি (বায়োচার) একটি ছোট উদ্যোগ কিন্তু এর গুরুত্ব ব্যাপক। আগামী দিনের জন্য বায়োচার প্রকল্পের ‘বায়োচার ও বায়োচার ইনরিচ অর্গানিক ফার্টিলাইজারের’ প্রচার-প্রসার এবং বানিজ্যিকীকরণ সক্ষমতা বৃদ্ধি বিষয়ক যে কর্মশালার আয়োজনের মধ্যে দিয়ে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রজেক্টের কার্যক্রম ভালোভাবে এগিয়ে যাবে।

এ সময় বক্তারা প্রকল্প উপন্নয়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন এবং ব্যবসা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশনা প্রদান করেন। নিজের প্রতি আস্থা রেখে, কাজের সাথে শেষ পর্যন্ত লেগে থেকে সাফল্য অর্জন করা বায়োচার প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটরের একটি মহৎ গুন বলে আখ্যায়িত করেন বক্তারা। বক্তারা প্রকল্পের উত্তর উত্তর সাফল্য কামনা করেন।

বায়োচার প্রজেক্টের কো-অর্ডিনেটর মিঃ সমীরন বিশ্বাস ‘বায়োচার ও বায়োচার ইনরিচ অর্গানিক ফার্টিলাইজারের প্রচার-প্রসার, ব্যবসা পরিকল্পনা, বানিজ্যিকীকরণ পদ্ধতি, উদ্যোক্তা ও উদ্যোক্তার কার্যক্রম, উদ্যেক্তার গুনাবলী, ভ্যালু চেইন, ভ্যালু চেইন এ্যাক্টর, সাপ্লাই চেইন, ব্র্যান্ডিং প্যাকেজিং, বায়োচার এন্টারপ্রাইজ গঠন ও গঠনতন্ত্রসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দক্ষতার সহিত তিনদিন ব্যাপি বিস্তারিত আলোচনা হবে।

তিনি বলেন, বায়োচার এক ধরনের কয়লা যার মধ্যে ৩৫%-৫৫% কার্বন থাকে। এই কয়লা সিসিডিবি উদ্ভাবিত এক ধরনের বিশেষ চুলায় (”কৃষি বন্ধু চুলা”) ৩০০-৬০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় স্বল্প অক্সিজেনের উপস্থিতিতে এবং পাইরোলাইসিস পদ্ধতিতে বায়োমাস পুড়িয়ে (বায়োচার) তৈরী করা হয়। কৃষিবিদরা বলছেন, বায়োচার একবার জমিতে দিলে তা শত শত বছর পর্যন্ত মাটিতে উপস্থিতি বজায় রাখতে সক্ষম, ফলে বাড়ে মাটির উর্বরতা। তাই রান্নার পাশাপাশি জমির গুনাগুন ধরে রাখতে বায়োচার ব্যবহরের আহ্বান জানান কৃষি কর্মকর্তাগণ।

বায়োচার ও কেঁচো সারের সংমিশ্রনে তৈরী হয় ‘বায়োচার ইনরিচ অর্গানিক ফার্টিলাইজার’ বা ‘কার্বন সমৃদ্ধ জৈব সার’ যার ফর্মূলেশন করে দিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষনা উন্নয়ন ইনিস্টিটিউট (বারী)। এ ইনিস্টিটিউট থেকে ফর্মূলেশনকৃত ‘বায়োচার ইনরিচ অর্গানিক ফার্টিলাইজার’ বা ‘কার্বন সমৃদ্ধ জৈব সার’ বানিজ্যিকীকরণ ও দেশব্যাপি কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষনা কাউন্সিলে (বার্ক) আবেদন করা হয়েছে যা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে এবং অতি শীগ্রই অনুমোদন পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। অনুমোদন পাওয়া মাত্র তা ব্র্যান্ডিং ও প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে বাজারে আসবে। হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে ‘বায়োচার ইনরিচ অর্গানিক ফার্টিলাইজার’ বা ‘কার্বন সমৃদ্ধ জৈব সার’ এর গবেষনা বিষয়ে চুক্তি করা হয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলি বিভিন্ন ফসলের উপর এ সারের ব্যবহার করে গবেষনা করছেন। বায়োচার প্রকল্পের মাঠ পর্যায়েও বিভিন্ন ফসলেরর উপর ‘কার্বন সমৃদ্ধ জৈব সার’ এর গবেষনা চলমান রয়েছে। মান্দা ও শিবালয় উপজেলায় প্রায় বার শতাধিক কৃষক ফুলকপি, বাধাকপি, সরিষা, গম, ধান, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ, ভুট্টা, লালশাক, ঢেঁড়স, বরবটি, বেগুন, লাউ, মিষ্টি কুমড়াসহ নানা ফসলি জমিতে এ সার ব্যবহার করছে। প্রকল্পটি আইসিসিও এবং কার্ক ইন এক্টাই এর সহায়তায় সিসিডিবি মাঠ পর্যায়ে ডি এ ইকে সাথে নিয়ে বাস্তবায়ন করছে।

‘বায়োচার ইনরিচ অর্গানিক ফার্টিলাইজার’ বা ‘কার্বন সমৃদ্ধ জৈব সার’ মাটির খরা, অম্লত্ব ও লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রন করে মটির স্থায়ী ¯া^াস্থ্যরক্ষা করে এবং মাটিতে অবস্থিত বিষাক্ত আর্সেনিক, ক্রোমিয়াম, সীসা ইত্যাদি ফসলে ঢুকতে বা আসতে দেয় না। ফলে ফসলের উৎপাদন ও গুণগত মান বাড়িয়ে কৃষকের আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এ সার মাটিতে বসবাসকারী অনুজীবের সংখ্যা শত শত গুন বাড়িয়ে দেয় এবং মাটির পানি ধারন ক্ষমতা ৫ গুন বৃদ্ধি করে। এটি রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমায় ৩০%-৪০%, যার ফলে উৎপাদন খরচ কমে আসে। এ সার ব্যবহারে বিষমুক্ত ফসল উৎপাদন সহজতর হয়।

মান্দায় ও শিবালয় উপজেলায় ‘কৃষি বন্ধু চুলা’’র ব্যবহার দিন দিন বেড়ে চলেছে। এ চুলায় রান্না, পরিবেশ দূষণ রোধের পাশাপাশি উৎপাদিত বায়োচার জমিতে ব্যবহারের ফলে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা হচ্ছে। কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জমিতে একবার বায়োচার ব্যবহার করলে শত শত বছর এর কার্যকারিতা থাকে তাই কার্বন সমৃদ্ধ বায়োচার বা কার্বন সমৃদ্ধ জৈব সার ব্যবহারে কৃষকের অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি জমির স্থায়ী উর্বরতা এবং ফলনও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

”কৃষি বন্ধু চুলা”য় কাঠ বা গোবর ও বিভিন্ন ধরনের বায়োমাস বা কৃষি অবশিষ্টাংশ পুড়িয়ে বায়োচার পাওয়া যায় যা কার্বন সমৃদ্ধ। এই কার্বন সমৃদ্ধ বায়োচার জমিতে ব্যবহারে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পায় এবং খরা প্রবণ এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে চাষাবাদ করা যায়। বায়োচার জমিতে ভারী ও বিষাক্ত ধাতুকে (হেভী মেটালকে) নিস্ক্রিয় করে রাখে ফলে উদ্ভিদের শিকড়ের সাহায্যে তা ফসল পর্যন্ত পৌঁছায় না ফলে পাওয়া যায় নিরাপদ ও বিষাক্ত ধাতু মুক্ত ফসল। এই চুলায় ৩৫-৪০% জ্বালানি কম লাগে তাই বনজ সম্পদ রক্ষা পায় ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে, খাদ্য নিরাপত্তায় এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় ব্যাপক ভূমিকা রাখবে বলে মত প্রকাশ করেন সশ্লিষ্ট কমর্কর্তাগণ।

দক্ষ প্রশিক্ষক বায়োচার প্রজেক্টের কো-অর্ডিনেটর এর নিকট হইতে প্রশিক্ষণ গ্রহনের মাধ্যমে এ প্রশিক্ষণটিতে অংশগ্রহনকারী কর্মীবৃন্দ জলবায়ু পরিবর্তন মোকবেলা এবং খাদ্যে স্বাবলম্বীতা অর্জনে মাটির স্থায়ী স্বাস্থ্য রক্ষায় কার্বন সমৃদ্ধ বায়োচার প্রযুক্তির ব্যবহার ‘বায়োচার ও বায়োচার ইনরিচ অর্গানিক ফার্টিলাইজার এর প্রচার-প্রসার এবং বানিজ্যিকীকরণ’ বিষয় সম্পর্কে সার্বিক দক্ষতা অর্জন করবে এবং এ প্রশিক্ষণকে কাজে লাগিয়ে প্রকল্পের কাজের গতি বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।